বৃদ্ধাশ্রম ও এতিমখানায় ভালোবাসার উষ্ণতা ছড়ালেন চট্টগ্রামের ‘মানবিক ডিসি’ মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা

জীবনের শেষ প্রান্তে এসে যাঁরা আপনজন হারিয়েছেন, হারিয়েছেন ঘর-সংসার—তাঁদের জন্য একটি মানবিক স্পর্শই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় আশ্রয়। এমনই অর্ধশতাধিক অসহায় প্রবীণের জীবনে নতুন করে মানবিক উষ্ণতা ছড়িয়ে দিলেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।

 

রোববার (১১ জানুয়ারি) বন্দরনগরীর বেওয়ারিশ মানবসেবা বৃদ্ধাশ্রম পরিদর্শনে গিয়ে জেলার শীর্ষ এই কর্মকর্তা শুধু আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পালনেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; বরং ভালোবাসা ও সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দেন প্রবীণদের দিকে।

 

বৃদ্ধাশ্রমে থাকা প্রতিটি প্রবীণের কাছে গিয়ে তিনি তাদের শরীর-স্বাস্থ্যের খোঁজ নেন, জীবনের গল্প শোনেন এবং নিজ হাতে শীতের কম্বল গায়ে জড়িয়ে দেন। পাশাপাশি প্রত্যেককে উপহার দেন সুস্বাদু ফলের ঝুড়ি।

 

বয়সের ভারে নুয়ে পড়া চোখে তখন কৃতজ্ঞতার অশ্রু—কারণ বহুদিন পর কেউ তাঁদের মানুষ হিসেবে পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন।

 

বেওয়ারিশ মানবসেবা বৃদ্ধাশ্রম পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সায়েরা বেগম বলেন, প্রতিষ্ঠার পর এই প্রথম কোনো জেলা প্রশাসক সরাসরি এই বৃদ্ধাশ্রম পরিদর্শনে এলেন।

 

তিনি বলেন,“ডিসি স্যার শুধু কম্বল দিয়ে দায়িত্ব শেষ করেননি; নিজ হাতে প্রত্যেক প্রবীণকে কম্বল পরিয়ে দিয়েছেন। ফলের ঝুড়িও দিয়েছেন। একজন প্রকৃত মানবিক মানুষ না হলে এমনটা সম্ভব নয়।”

 

জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, প্রতিটি ঝুড়িতে আঙুর, কমলা, আপেল ও কেক ছিল। বৃদ্ধাশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক গোলামুর রহমান রব্বানী বলেন,

“প্রবীণ মানুষগুলোকে কেউ মনে রাখে—এই অনুভূতিটাই তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। জেলা প্রশাসকের এই আন্তরিক উদ্যোগ আমাদের নতুন করে আশাবাদী করেছে।”

 

বৃদ্ধাশ্রম পরিদর্শন শেষে জেলা প্রশাসক নগরীর কদম মোবারক মুসলিম এতিমখানায় যান। সেখানে তিনি ৩২৫টি কম্বল এতিম শিশুদের মাঝে বিতরণ করেন এবং শিশুদের সঙ্গে সময় কাটিয়ে তাদের পড়াশোনা, আবাসন ও সামগ্রিক কল্যাণ বিষয়ে খোঁজখবর নেন।

 

এতিমখানার অধ্যক্ষ আবুল কাসেম বলেন,

“জেলা প্রশাসকের সরাসরি উপস্থিতি ও মানবিক সহায়তা আমাদের জন্য অত্যন্ত অনুপ্রেরণাদায়ক। শিশুদের মুখের হাসিই প্রমাণ করে—এই ভালোবাসা কতটা মূল্যবান।”

 

এতিমখানা পরিচালনা কমিটির অর্থ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার জাবেদ আবসার চৌধুরী বলেন,

“এতিম শিশুদের সংখ্যা জানার পরই তিনি তিন শতাধিক কম্বল পাঠিয়েছেন। ডিসি স্যার অত্যন্ত অমায়িক ও আন্তরিক। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তাঁর মানবিক কর্মকাণ্ড চট্টগ্রামে চোখে পড়ছে।”

 

হল সুপার আব্দুল মোবিন বলেন, “চার দশকের চাকরি জীবনে এমন মানবিক জেলা প্রশাসক দেখিনি। তিনি প্রতিটি শিশুর সঙ্গে কথা বলেছেন, তাদের সমস্যার কথা জানতে চেয়েছেন।”

 

এ সময় জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, “সমাজের সবচেয়ে অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। শীতবস্ত্রের সঙ্গে যদি সামান্য ভালোবাসা ও মানবিক স্পর্শ পৌঁছে দিতে পারি, সেটাই আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন।”

 

তিনি আরও বলেন,“এই শিশুরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। তাদের নিরাপদ ও মানবিক পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজ—উভয়ের সম্মিলিত দায়িত্ব।” এ ধরনের মানবিক কার্যক্রম ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলেও আশ্বাস দেন জেলা প্রশাসক।

  • নিজস্ব সংবাদদাতা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *