ভুয়া গ্রেপ্তারি পরোয়ানায় কর্ণফুলীর রেজাউলকে ফাঁসানোর অভিযোগ ; আদালত ও পুলিশের নথিতে গুরুতর অসঙ্গতি

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার চরলক্ষ্যা ইউনিয়নের গোয়ালপাড়া মোনাফ ফকির বাড়ির বাসিন্দা রেজাউল করিম (৪৯)–এর বিরুদ্ধে হঠাৎ ঢাকার ধানমন্ডি থানার একটি হত্যা মামলার গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির খবরে কর্ণফুলীসহ চট্টগ্রাম আদালত ভবনে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। প্রাথমিক যাচাইয়ে পরোয়ানাটি ভুয়া ও জাল বলে প্রমাণিত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

 

জানা গেছে, গত ১৫ ডিসেম্বর কর্ণফুলী থানার একটি সূত্রের মাধ্যমে রেজাউল করিম জানতে পারেন, তাঁর নামে ধানমন্ডি থানার একটি হত্যা মামলার গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এসেছে। সংশ্লিষ্ট ওয়ারেন্ট কপিটি সিএমপির এডিসি (প্রসিকিউশন) কার্যালয়ে ১১ অক্টোবর গ্রহণ করা হয়, যার স্মারক নম্বর ছিল ‘প্রসিকিউশন-৮৯১’।

 

খবরটি জানার পর রেজাউল করিম কর্ণফুলী থানা থেকে ওয়ারেন্টের একটি ছায়াকপি সংগ্রহ করেন এবং সেটি চট্টগ্রাম আদালত ভবনের প্রসিকিউশন বিভাগে কর্মরত এক মামলা রেজিস্ট্রার (জিআরও)–কে দেখান। প্রাথমিকভাবে জিআরও জানান, নথিটি পুলিশের ক্রাইম ডাটা ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (সিডিএমএস) হয়ে ঢাকার আদালত থেকে এসেছে।

 

তবে রেজাউল করিম দাবি করেন, তিনি ঢাকায় বসবাস করেন না এবং গত বছরে সংঘটিত কোনো হত্যা মামলার সঙ্গেও তাঁর সম্পৃক্ততা নেই।

 

ভুক্তভোগীর অভিযোগের পর জিআরও নথিটি পুনরায় যাচাই করে তাতে একাধিক অসঙ্গতি ও জালিয়াতির লক্ষণ পান। পরে বিষয়টি চট্টগ্রাম আদালতের আইনজীবী আনোয়ার হোসেনকে জানানো হলে তিনি ওয়ারেন্ট কপিতে গুরুতর আইনগত ত্রুটির কথা জানান।

 

আইনজীবী আনোয়ার হোসেন বলেন, “ওয়ারেন্ট কপিতে একাধিক ও পরস্পরবিরোধী তারিখ রয়েছে—১ জুলাই ২০২৫ এবং ১১ অক্টোবর ২০২৫। অথচ একটি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা একটি নির্দিষ্ট আদেশ তারিখে জারি হয়। একই নথিতে ভবিষ্যৎ ও অতীত তারিখ একসঙ্গে থাকা আইনগতভাবে অগ্রহণযোগ্য।”

 

তিনি আরও বলেন, মামলার নম্বর ও জিআর/সিআর সংক্রান্ত অংশে হাতে লেখা সংখ্যা, কেটে লেখা ও বিভিন্ন ফরম্যাটে নম্বর উল্লেখ রয়েছে। কোথাও স্পষ্টভাবে পূর্ণাঙ্গ মামলা নম্বর বা আদালতের নির্ধারিত রেজিস্ট্রেশন স্টাইল নেই, যা বিচারিক নথির মৌলিক শর্ত লঙ্ঘন।

 

আইনজীবীর ভাষ্য অনুযায়ী, ওয়ারেন্ট কপিতে ব্যবহৃত সিল ও স্বাক্ষরের গঠনও অস্বাভাবিক। একাধিক সিল থাকলেও সেগুলোর লেখা আংশিক অস্পষ্ট, কোথাও সিল একটির ওপর আরেকটি চাপানো, আবার স্বাক্ষরের সঙ্গে সিলের সঠিক অ্যালাইনমেন্ট নেই। বিচারিক ওয়ারেন্টে সাধারণত নির্দিষ্ট আদালতের একটি নির্ধারিত সিল ও ম্যাজিস্ট্রেটের স্পষ্ট স্বাক্ষর থাকার কথা।

 

এ ছাড়া ফরম ও লেআউটেও গুরুতর ত্রুটি রয়েছে—অতিরিক্ত হাতে লেখা সংযোজন, লাইনের বাইরে লেখা, অফিসিয়াল প্রিন্টেড অংশ আংশিক ঢেকে যাওয়া, ক্ষমতাপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেট বা আদেশদাতা আদালতের পরিচয় অস্পষ্ট। এমনকি কাকে, কখন এবং কোন থানার মাধ্যমে ওয়ারেন্ট কার্যকর হবে—সে নির্দেশনাও স্পষ্ট নয়, যা ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী বাধ্যতামূলক।

 

পর্যালোচনায় দেখা গেছে, নথিটিতে একাধিক ধরনের কালি ও ভিন্ন ভিন্ন হাতের লেখা রয়েছে, যা ইঙ্গিত দেয়—এটি একই সময়ে, একক কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রস্তুত হয়নি।

 

ওয়ারেন্ট কপিটিতে মোট ছয়টি সিল দেখা যায়—চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ঢাকা, পুলিশ সুপারের কার্যালয় চট্টগ্রাম, ধানমন্ডি জিআর শাখা, প্রসিকিউশন বিভাগ ঢাকা, এডিসি (প্রসিকিউশন) সিএমপি, অতিরিক্ত মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-৩ ঢাকা এবং আরেকটি অস্পষ্ট গোল সিল।

 

ওয়ারেন্টে ধানমন্ডি থানার মামলা নম্বর ৩(১১)২৪, মামলার ধারা ৩২৩/৩২৬/৩০২/৩৪ দণ্ডবিধি উল্লেখ থাকলেও পরে ঢাকায় গিয়ে এজাহার সংগ্রহ করে ভুক্তভোগীর পরিবার চমকে ওঠে।

 

ধানমন্ডি থানার ওই মামলাটি মূলত দস্যুতা (৩৯৩ ধারা) অভিযোগে করা। মামলার বাদী র‍্যাব-২ এর এসআই অনিল জীবন চাকমা। এজাহারে চারজন আসামির নাম রয়েছে, কিন্তু রেজাউল করিমের নাম সেখানে নেই।

 

তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মোহাম্মদ শরীফ বলেন, “এই মামলায় চট্টগ্রামের কেউ আসামি নয়। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাদের বিরুদ্ধেই চার্জশিট দেওয়া হয়েছে।”

 

ধানমন্ডি থানার জিআরও এসআই মোহাম্মদ বাশার জানান, “চট্টগ্রাম থেকে একজন এই মামলার গ্রেপ্তারি ওয়ারেন্ট নিয়ে এসেছিলেন, কিন্তু ওয়ারেন্টে থাকা ব্যক্তি এ মামলার আসামি নন। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”

 

ভুক্তভোগী রেজাউল করিম অভিযোগ করেন, জমিজমা বিরোধকে কেন্দ্র করে একটি প্রভাবশালী চক্র তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে ফাঁসানোর চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, “এই ডিজিটাল যুগে ভুয়া গ্রেপ্তারি পরোয়ানা তৈরি করে নিরীহ মানুষকে হত্যা মামলার আসামি বানানো ঘৃণিত অপরাধ। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।”

 

কর্ণফুলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাহেদুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি গণমাধ্যমের মাধ্যমে জেনেছেন এবং ওয়ারেন্ট অফিসারকে যাচাই-বাছাইয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

পুরোনো সমস্যা, সমাধান অধরাই।

 

জানা গেছে, ভুয়া ওয়ারেন্ট ঠেকাতে ২০২০ সালে হাইকোর্ট সাত দফা নির্দেশনা দিলেও বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি। এখনো ভুয়া ওয়ারেন্টের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

 

সিনিয়র আইনজীবী মাহমুদুল হক বলেন, আদালতের নাম ও সিল ব্যবহার করে জালিয়াতির মাধ্যমে মানুষকে হয়রানি করা গুরুতর অপরাধ। এ ধরনের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

  • নিজস্ব সংবাদদাতা ক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *