চট্টগ্রামের ২৮ সাংবাদিককে জড়িয়ে অপহরণচেষ্টা মামলা—তদন্তে মিলল না প্রমাণ চারবার নোটিশেও হাজির নন বাদী, সাক্ষী-আলামতও নেই—১০৯ জনের মামলায় পিবিআই প্রতিবেদন

নিজস্ব প্রতিবেদক

 

ক্ষমতাচ্যুত বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের
সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, চট্টগ্রামের অন্তত ২৮ সাংবাদিকসহ মোট ১০৯ জনের বিরুদ্ধে করা অপহরণচেষ্টা, হামলা ও মিথ্যা সংবাদ প্রচারের মামলার তদন্তে কোনো সত্যতা পায়নি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

সংস্থাটি গত ২৪ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের আদালতে তাদের তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। তবে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে রোববার, যা নগরজুড়ে আলোচনার সৃষ্টি করেছে।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মামলার অভিযোগ সমর্থন করার মতো কোনো সাক্ষ্য, প্রমাণ বা আলামত পাওয়া যায়নি। মামলার বাদীকে বক্তব্য দেওয়ার জন্য চার দফা নোটিশ পাঠানো হলেও তিনি তদন্ত কর্মকর্তাদের সামনে হাজির হননি। পিবিআই কর্মকর্তারা তার বাসায় গিয়েও তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করেন। তখন তিনি তথ্য দেবেন বলে আশ্বাস দিলেও পরে আর যোগাযোগ করেননি।

এমনকি মামলায় যেসব সাক্ষীর নাম-ঠিকানা দেওয়া হয়েছিল, তদন্তে তাদের কাউকেও খুঁজে পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ মেলেনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

২০২৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর নগরের মোহরা সায়রা খাতুন কাদেরিয়া গার্লস হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ হাসিনা মমতাজ চট্টগ্রামের আদালতে মামলাটি দায়ের করেন। আদালত পরবর্তীতে মামলার তদন্তের দায়িত্ব দেয় পিবিআইকে।

মামলার অভিযোগে বলা হয়েছিল, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সময় সাংবাদিকরা প্রকৃত ঘটনা গোপন করে উদ্দেশ্যমূলক ও বানোয়াট সংবাদ প্রকাশ করেছেন। এছাড়া নিউমার্কেট এলাকায় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার সময় কিছু সাংবাদিক শিক্ষার্থীদের মারধর করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হাতে তুলে দেন বলেও অভিযোগ তোলা হয়।

বাদী দাবি করেছিলেন, ওই ঘটনায় তাকে অপহরণের চেষ্টাও করা হয়েছিল, যদিও তিনি শেষ পর্যন্ত নিজেকে রক্ষা করতে সক্ষম হন।

মামলায় সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত ছাড়াও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরীর মা ও চট্টগ্রাম মহানগর মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হাসিনা মহিউদ্দিন, বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমের অন্তত ২৮ সাংবাদিকের নাম উল্লেখ করা হয়।

অভিযুক্তদের মধ্যে দৈনিক আজাদীর শুকলাল দাশ, বাংলাদেশ প্রতিদিনের রিয়াজ হায়দার চৌধুরী, সময় টিভির প্রমল কান্তি দে কমল, ইনডিপেনডেন্ট টিভির অনুপম শীল, চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক দেবদুলাল ভৌমিক, বাংলানিউজ২৪ ডটকমের তপন চক্রবর্তী, একুশে টিভির একরামুল হক বুলবুল, বিডিনিউজ২৪ ডটকমের মিন্টু চৌধুরী ও উত্তম সেন গুপ্ত, সমকালের কুতুব উদ্দিন, দীপ্ত টিভির রুনা আনসারিসহ আরও অনেক সাংবাদিকের নাম ছিল।

এছাড়া যুবলীগ নেতা হেলাল আকবর চৌধুরী, ছাত্রলীগের সাবেক নেতা নুরুল আজিম রনিসহ কয়েকজন রাজনৈতিক নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়। মামলায় আরও ৫০ থেকে ৬০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছিল।

তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে মামলার বাদী হাসিনা মমতাজ গণমাধ্যমকে বলেন, তিনি বাড়িতে ছিলেন এবং তার ভাই পিবিআই কার্যালয়ে গিয়েছিলেন। এভাবে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া ঠিক হয়নি বলে দাবি করে তিনি

অন্যদিকে মামলায় অভিযুক্ত দীপ্ত টিভির সাংবাদিক রুনা আনসারি বলেন, তারা পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেই সংবাদ প্রকাশ করেছিলেন। কোনো পক্ষের হয়ে নয়। তারপরও এই মামলার কারণে তাকে এবং তার পরিবারকে সামাজিকভাবে নানা বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। একজন নারী সাংবাদিক হিসেবে তাকে নানা জবাবদিহির মুখে পড়তে হয়েছে বলে জানান তিনি।

পুলিশ ও আদালত সূত্র জানায়, গত বছরের জুলাইয়ের আন্দোলনকে ঘিরে চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলায় এ পর্যন্ত অন্তত ১৪৮টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় এজাহারভুক্ত আসামির সংখ্যা ১৩ হাজার ২৭ জন। এর বাইরে অজ্ঞাতনামা আসামির সংখ্যা অন্তত ৩০ হাজার।

এসব মামলায় রাজনৈতিক নেতা-কর্মীর পাশাপাশি ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন পেশার মানুষকেও আসামি করা হয়েছে, যা নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *